ছায়ার ওপাশে - ভূত থেকে বিসিএস অবধি
উর্মী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। উর্মী কে হাবিব নামের একটা ছেলে পাগলের মতো ভালোবাসে। সেজন্য উর্মী মৃত্যুর পরেও হাবিবকে ছায়ার মতো দিক নির্দেশনা দিতে থাকে।

নিজুম রাত ক্যাম্পাসের ডায়না চত্বরে বসে আছে হাবিব। সামনেই ফুটবল মাঠ সেখানে কিছু ছেলে বসে আড্ডা দিচ্ছে।
আজ তার (হাবিবের) খুব খারাপ লাগছে। কেন যেন কোন কাজেই তার মন বসছে না। মনের ভিতর তার যেন একটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে। এমন সময় সাজিদ তার পাশে এসে বসল।
সাজিদ হাবিবকে বলল চল দোস্ত প্যারাডাইস রোড থেকে ঘুরে আসি। হাবিব ভুত দেখার মতো তাকালো সাজিদের দিকে।
এরপর বলে মাথা খারাপ! রাত ১১ টার দিকে প্যারাডাইসে গেলে আর যদি ভিসি বা প্রক্টর স্যারের চোখে পড়ি তাহলে কালকেই ছাত্রত্ব বাতিল হয়ে যাবে।
তারা আস্তে আস্তে তাদের হলের দিকে যেতে থাকে। সাজিদ ও হাবিব দুজনেই লালন শাহ হলে থাকে। হলে গিয়ে হালকা নাস্তা করে বিছানায় পিঠ লাগালো।
সে বুঝতে পারছে না, তার ঘুম আসছিল না। সে একটা মেয়েকে খুব ভালোবাসে। কিন্তু মেয়েটিকে কোন ভাবেই বলতে পারছে না। আর সে মেয়ে অন্য কাউকে ভালোবাসে কিনা সেটাও বুঝতে পারছিল না।
অনেক কষ্ট ঘুমিয়ে গেলো। কাল সকাল ৯ টায় তায় ক্লাস আছে। সেজন্য সকাল সকাল উঠতে হবে। ওহ হ্যাঁ, বলতে ভুলেই গিয়েছি; হাবিবুর রহমান হাবিব একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেমে অনার্স ৩য় বর্ষে পড়াশোনা করে।
আর সে যে মেয়ে কে পছন্দ করে তার নাম উর্মী। সে (উর্মী) ইংরিজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে অনার্স ৩য় বর্ষে পড়াশোনা করে। হাবিবের মনে এটাও ভয়, তারা এক ব্যাচ এজন্য হয়তো রিজেক্ট হয়ে যাবে।
কিন্তু আবার একটা আশার আলো হাবিবের সাথে ওয়াট’স এপ ম্যাসেঞ্জারে ভালোই গল্প করে। কিন্তু এই কথা জানালে হয়তো আর কোন দিন কথা বলবে না। তা সে বলবে কি না এটাও ভাবতে থাকে।
পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সাজিদ ক্লাসের দিকে যেতে থাকে। সাজিদ লালনের মোড় থেকে নাস্তা করে ক্রিকেট মাঠ দিয়ে রবিন্দ্র-নজরুল অনুষধ ভবনের পাশে জিমনেসিয়াম গিয়ে উঠে।
আর সেখানে গিয়েই দেখতে পাই বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা হল থেকে উর্মী ক্লাসের দিকে আসতেছে। ইংরেজি বিভাগ রবিন্দ্র নজরুল অনুষধ ভবনে।
আর একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেম ব্যাবসা প্রশাসন ভবনে। বঙ্গমাতা হল থেকে আসতে আগে ব্যাবসা প্রশাসন ভবন পড়ে তারপর রবিন্দ্র-নজরুল।
আবার লালন হল থেকে ব্যাবসা প্রশাসনে গেলে আগে রবিন্দ্র-নজরুল এরপর ব্যাবসা প্রশাসন। যার জন্য তাদের যাওয়া আসার পথে নিয়মিত দেখা হয়ে যায়।
ক্লাসে যাওয়ার সময় দেখা হওয়ায় উর্মী নিজেই হাবিবকে ডাক দিয়ে বিকালে মফিজ লেকের পাড়ে দেখা করতে বলে। হাবিবের মনে নানান প্রশ্ন ঘুরতে থাকে।
কি বলবে উর্মী। এর আগে তো তাকে এই ভাবে দেখা করতে বলে নাই। যাইহোক সে ক্লাসে গিয়ে পড়াশোনায় মন দেয়।
ক্লাস শেষ করে রুমে ফিরে যায়। গোছল করে খাওয়া দাওয়া করে বসে থাকে। কিন্তু তার সময় যেন কাটছেই না। একেকটা মিনিট তার কাছে একেক ঘন্টার মতো লাগছিল।
অবশেষে সকল অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আছরে আযান দেয়। সে বের হয়ে যায়। ইবি লেক সংলগ্ন কেন্দ্রীয় জা’মে মসজিদে নামাজ পড়ে লেকের পাড়ে বসে থাকে। সূর্য একটু হেলে গেলে উর্মী আসে।
উর্মীর আসা দেখে হাবিবের মনে খুশির দোলা দেখা দেয়। কিন্তু উর্মীর মনটা খুব মলিন সেটাও কিছুটা ভাবিয়ে তোলে। উর্মী এসে হাবিবের পাশে বসে প্রথমে কুশল জিজ্ঞাসা করে।
এরপর সে জানাই তার দাদী খুব অসুস্থ তাকে দেখতে বাড়ি যেতে হবে। এমন অবস্থা তিনি হয়তো আর বাঁচবেন না।
হাবিবকে জানিয়ে রাখি সে যেন সাজিদের কাছ থেকে প্রত্যেকদিনের ক্লাসের নোট গুলা সংগ্রহ করে রাখে। হাবিব উর্মীর কথায় সম্মতি জানায়। উর্মী রাতের গাড়িতে মাগুরা চলে যায়।
হাবিব এইদিকে নোট সংগ্রহ করতে থাকে। আর উর্মীর জন্য অপেক্ষা। উর্মীর ১৫ দিন পরে ফিরে আসার কথা ছিল কিন্তু আজ ২৭ দিন হতে চলল উর্মীর কোন খোজ নেই।
উর্মীর মোবাইল ফোন টাও বন্ধ। খুব চিন্তায় পড়ে যায় হাবিব। কি করবে না করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না।
সে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যাওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত সে ফেসবুক ওয়াটস এপ বা ইমু কোন কিছুতেই একটিভ হয় নাই। হাবিব মনে মনে ভাবে হয়তো দাদী খুব অসুস্থ তাই আসছে না।
আবার ভাবে এক মাস হতে চলল একবারো আমাদের কথা মনে পড়ল না! উর্মীর অন্তরঙ্গ বন্ধু খুশিও এই বিষয়ে কিছু বলতে পারে না। তার সাথেও নাকি কোন ভাবে যোগাযোগ করতে পারছে না।
হাবিব আস্তে আস্তে খুব বিষন্ন হয়ে যাচ্ছিল। রাত ১১ টার দিকে কোন ভাবেই রুমের ভিতর তার মন টিকছিল না।
তাই সে হল থেকে বের হয়ে আসে আস্তে আস্তে হাটতে হাটতে ডায়না চত্বরে উলটো পাশে আম বাগানের কাছে বসে। দু’হাটুর মাঝে মাথা রেখে চিন্তা করছিল।
হঠাৎ একটা মেয়েলি কন্ঠে কে যেন ডেকে উঠল হাবিব! হাবিব মাথা তুলে দেখল তার সামনে উর্মী দাঁড়িয়ে আছে।
উর্মীকে দেখে সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে কেঁদে ফেলে; উর্মী তার ওরনা দিয়ে চোখের পানি মুছে দেয়। এরপর হাবিবকে বলো চলো আমরা ক্যাম্পাসে হেটে বেড়ায়।
হাঁটতে হাঁটতে গ্রন্থগারের সামনে দিয়ে লেকের পাড়ের দিকে যায়। আইসিটি সেলের পাশের ফুল বাগান থেকে ফুল তুলে হাবিব উর্মীর খোপাতে বেধে দেয়।
এইভাবে তারা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন যায়গায় ঘুরে বেড়ায়। প্রায় রাত দেড়টার দিকে হাবিবকে বলে আমি হলের দিকে যায় তুমিও হলে যাও। হাবিব সরল মনে রুমে চলে যায়।
পরের দিন ঘুম থেকে উঠে উর্মীর খোজ করে কিন্তু কেউ উর্মীর খোজ দিতে পারে না। কিন্তু সারারাত উর্মীর সাথে হাবিব ঘুরেছে এটাতো আর বলতে পারছে না। হাবিব এক ধরণের বিপাকে পড়ে যায়।
সে ফ্যাকাল্টি থেকে উর্মীর বাবার নাম্বার সংগ্রহ করে এবং ফোন দেয় এরপর যা শুনে তাতে সে পাথর হয়ে যায়। কথা সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর সেই বিখ্যাত উক্তি মনে পড়ে যায় “অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর।
উর্মীর বাবা জানাই আজ থেকে ২৮ দিন আগে সড়ক দুর্ঘটনায় উর্মী ইহধাম ত্যাগ করেছে। কথাটা শুনে হাবিব একবারে ভেংগে পড়ে।
তখন সে বুঝে উঠে তাহলে উর্মী কি আমাকে ভালোবাসত। আমার ভালোবাসার টানে চলে এসেছে! সে রাতে উর্মী হাবিবকে বেশ কিছু পরামর্শ দিয়ে যায়।
উর্মীর সকল পরামর্শ মেনে নিয়ে হাবিব নিজেকে গড়তে থাকে। আর উর্মী হাবিবকে ছায়ার মতো তাকে পরামর্শ গাইড লাইন দিতে থাকে। উর্মীর পরামর্শ ও গাইড লাইনে হাবিব আজ বিসিএস ক্যাডার হতে পেরেছে।
আরও পড়ুনঃ স্বাক্ষরঃ রেণু তোমার থাকাটা খুব জরুরী