জালিয়ানওয়ালাবাগ – অব্যাহত এক হত্যালীলা

একশো বছর। একেশো বছর পর কিছুটা হলেও ভারতবাসীর ক্ষোভ প্রশমিত হল। অবশেষে দুঃখ প্রকাশ করলেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে। কেন করলেন? ১৯১৯ সালের ১৩ই এপ্রিল ঘটে যাওয়া এক বর্বরোচিত হত্যাকান্ডের জন্য। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড। পরাধীন ভারতবর্ষের ইতিহাসে সম্ভবত সবচয়ে ঘৃণ্য ও নারকীয় হত্যাকান্ড।

জালিয়ানওয়ালাবাগ – অব্যাহত এক হত্যালীলা
জালিয়ানওয়ালাবাগ – অব্যাহত এক হত্যালীলা | ছবি সংগ্রহীত


একশো বছর। একেশো বছর পর কিছুটা হলেও ভারতবাসীর ক্ষোভ প্রশমিত হল। অবশেষে দুঃখ প্রকাশ করলেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে। কেন করলেন? ১৯১৯ সালের ১৩ই এপ্রিল ঘটে যাওয়া এক বর্বরোচিত হত্যাকান্ডের জন্য। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড। পরাধীন ভারতবর্ষের ইতিহাসে সম্ভবত সবচয়ে ঘৃণ্য ও নারকীয় হত্যাকান্ড।


২০১৯ এর ১৩ই এপ্রিল সেই ঘটনার উল্লেখ করে থেরেসা মে দেশের পার্লামেন্টে বলেন, ‘সেদিনের ঘটনার জন্য আমরা গভীরভাবে দুঃখিত।’ অপরদিকে এই হত্যাকাণ্ডে মৃতদের উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ হাই কমিশনারের পক্ষ থেকেও শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা হয়। তাদের পক্ষ থেকে এই ঘটনাকে ‘ব্রিটিশ-ভারতের ইতিহাসে একটি ঘৃণ্য ঘটনা’ বলেও অভিহিত করা হয়।


ভারতের ব্রিটিশ হাই কমিশনার ডমিনিক অ্যাসকুইথ এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘১০০ বছর হয়ে গেল জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের। এই ঘটনা ব্রিটিশ-ভারতের ইতিহাসের অন্যতম ঘৃণ্য ঘটনা হিসাবে পরিগণিত হবে। এই ঘটনার জন্য আমরা গভীরভাবে দুঃখপ্রকাশ করছি।’


উপরিউল্লিখিত ঘটনার পর আরও দু’টি বছর কেটে গিয়েছে। এই বছর ১০২ বছর পূর্ণ হল সেই নির্মম ঘটনার। একদিক থেকে বিচার করলে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসাবে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডকে আমরা মনে করতেই পারি। এত বড় একটা ঘটনা না ঘটলে ভারতবর্ষ তোলপাড় হত কি না সন্দেহ।


১৭৫৭ সাল থেকে শুরু হয়ে পরবর্তী একশো বছরের ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত না ঘটনার মধ্যে দিয়ে ভারতবর্ষ সম্পূর্ণরূপে ইংরেজ শাসনের অধীনে চলে যায়। যত দিন গিয়েছে ভারতীয়দের প্রতি ব্রিটিশ সরকারে অত্যাচারের মাত্রা ততই বৃদ্ধি পেয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকেই ভারতের এক শ্রেণীর উদীয়মান ধনী ও উচ্চমধ্যবিত্তদের মধ্যে স্বাধীনতা লাভের সদিচ্ছা জাগে। এর ফল স্বরূপ ১৮৮৫ সালে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা লাভ করে। প্রথম প্রথম ভারতীয়দের লক্ষ ছিল ইংরেজ শাসন ব্যবস্থার মধ্যে থেকেই ন্যায়বিচার ও স্বায়ত্তশাসনের অধিকার লাভ করা।


ব্রিটিশ সরকার কিন্তু এই দাবী মনে নেয় নি। তাদের যুক্তি ছিল, ভারতবর্ষ স্বায়ত্তশাসন লাভের উপযুক্ত নয়। এরই মধ্যে শুরু হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ১৯১৪ সালে। এই যুদ্ধে ভাতরীয়দেরও অংশ নিতে বাধ্য করা হয়। ব্রিটিশ সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যুদ্ধে অংশ নিলে ভারতবর্ষকে স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা হবে। তাদের কথায় বিশ্বাস করে ভারতবর্ষ বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।


প্রায় পনের লক্ষ ভারতীয় সৈন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে প্রায় চুয়াত্তর হাজার সৈন্য নিজের প্রাণ দিয়েছিলেন। সস্ত্রীক মহাত্মা গান্ধীও এই যুদ্ধে পরোক্ষভাবে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি ও তাঁর স্ত্রী কস্তুরবা গান্ধী সেই সময় ইংল্যান্ডে ছিলেন। ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টে তাঁরা দু’জনেই হাসপাতালের স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেন। ফ্রান্স ও বেলজিয়ামে যুদ্ধে আহত ভারতীয় সৈন্যদের জন্য ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলে একটি সামরিক হাসপাতাল তৈরি করা হয়েছিল। কস্তুরবা ছিলেন সেই হাসপাতালে ভারতীয় সেনাদের দেখভালের দায়িত্বে।


এই সময়ে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সরকারের ভয়াবহ চরিত্র সকলের সামনে আসে। ব্রিটিশ সরকার এই সময়ে শ্রমজীবী জনগণের উপর ট্যাক্সের পরিমাণ শতকরা ৫০ ভাগ বাড়িয়ে দেয়। বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য, বিশেষ করে নুনের উপর করবৃদ্ধি সমাজের দরিদ্র শ্রেণীর মানুষের জীবনে চরম দুর্দশা ডেকে নিয়ে এল। বিপুল হারে সামরিক ও অসামরিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধি ঘটল। দ্রুত ব্যাপক হারে নোট ছাপার ফলে মুদ্রাস্ফীতি মারাত্মক আকার ধারন করল, যার ফল হলো অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। তৎকালীন কলকাতায় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ঘটেছিল শতকরা ১০০ ভাগ। ভারতের অন্যান্য জায়গাগুলিতেও একইভাবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ঘটলো।


যাইহোক ১৯১৮ সালের ১১ই নভেম্বর শেষ হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের আগের মনোভাবের কোন পরিবর্তন দেখা যায় না। যুদ্ধে যে সকল সেনা অংশ নিয়েছিলেন তাদের কাজ কেড়ে নিয়ে নিজ নিজ গ্রামে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়। শুরু হয় দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক মন্দা।


এরই মধ্যে দেখা দেয় স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েঞ্জা। সরকারের চরম উদাসীনতার ফলে আমাদের দেশের প্রায় পঞ্চাশ থেকে আশি ভাগ মানুষ এই মহামারীর কবলে পড়েছিলেন। ব্রিটিশদের বর্ণবৈষম্য আরও কোনঠাসা করে ভারতীয়দের। ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ক্রমেই জনে উঠতে থাকে মানুষের মনে। বিদ্রোহ ও অসহিষ্ণুতার আঁচ পেয়ে, সরকার দুটি পৃথক আইন তৈরী করে।


প্রথমত ব্রিটিশ সরকার ভারতীয়দের শাসনতান্ত্রিক কিছু সুবিধা দান করে সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করে। ১৯১৯ সালে ব্রিটিশ সরকার একদিকে মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার আইন নামে একটি নতুন আইন প্রণয়ন করেন। যেখানে ভারতের শাসনব্যবস্থাকে দু’ভাগে ভাগ করে দেওয়ার সিন্ধান্ত নেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় সরকার এবং প্রাদেশিক সরকার। এই দুই ভাগের মধ্যে দেশরক্ষা, পররাষ্ট্র বিভাগ, পরিবহণ, ডাক ও তার, মু্দ্রাব্যবস্থা, এগুলি কেন্দ্র সরকারের অধীনে থাকে এবং স্বাস্থ্য, জল, বিদ্যুৎ, বন, সেচ বিচার, কারাগার, রাজস্ব ইত্যাদির ভার প্রাদেশিক সরকারের হাতে দেওয়া হয়।


এর পাশাপাশি আবার রাওলাট আইন প্রবর্তন করে সরকার বিরোধী সব বিক্ষোভ শক্ত হাতে দমন করতে সচেষ্ট হয়। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতবাসীর সব রকমের রাজনৈতিক আন্দোলনকে দমন করা ও তাদের যাবতীয় বৈপ্লবিক কর্মপ্রচেষ্টা থেকে বিরত রাখা।


এই আইনে যে শর্তগুলি রাখা হয়েছিল সেগুলি হল,

১) ব্রিটিশ বিরোধী যে কোন কাজ দন্ডনীয় অপরাধ বলে বিবেচিত হবে।

২) সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বিনা বিচারে এমন কি আগে থেকে সতর্ক না কোরেও গ্রেপ্তার করা যাবে। তাদের বাড়িঘর বিনা অনুমতিপত্রেও তল্লাশি করা যাবে।

৩) বিচারক কোন প্রকার সাক্ষ্য প্রমাণ ছাড়াই বিচার ও রায়দানের কাজ করতে পারবেন। এমনকি বিচারক যে রায় দেবেন তার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে কোন আর্জি জানানো যাবে না।

এছাড়া সংবাদপত্রের স্বাধীনতার উপরও নানা বিধি নিষেধ জারি করা হয়।

বিশ্ব পরিবেশ দিবস এর শুরুটা কিভাবে হয়েছিল? জানুন তার ইতিহাস

পৃথিবীতে দুর্গাপূজার সূচনা কোথায়? বিচিত্র ইতিহাস ও আসল সত্য

ফ্যাশন ইতিহাসে সবথেকে বিপদজনক ফ্যাশন ট্রেন্ড, জানলে চমকে উঠতে হবে

মাতৃ দিবস পালনের তাৎপর্য ও ইতিহাস জানুন


রাওয়াল অ্যাক্ট চাল হয় ১৯১৯ সালের ১০ই মার্চ। শর্তাবলী দেখে গান্ধীজি বুঝতে পারলেন ব্রিটিশরা ভারতীয়দের ঠকাচ্ছে। মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার আইন একটি প্রহশন মাত্র। যে ভারতীয়রা বিশ্বযুদ্ধে নিজেদের প্রাণ বলি দিল ব্রিটিশদের হয়ে তাদের কোন প্রতিদান তো দেওয়া হলই না, উল্টে তাদের পরিবার পরিজনের উপরই নেমে আসতে লাগল শাসক সরকারের আঘাত। খবরের কাগজের স্বাধীনতায় বাধা, যাকে তাকে সন্দেহের বশে তুলে নিয়ে গিয়ে নির্বচারে অত্যাচার এ সবই কেবলমাত্র ভারতীয়দের মাথা তুলে দাঁড়ানো থেকে বিরত করার চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়।


বিশ্বযুদ্ধে পাঞ্জাব থেকে সেনা নেওয়া এবং যুদ্ধ শেষ হতেই তাদের দমন করার মনোভাব সেখাকার মানুষ ভালোভাবে নেয়নি বলাই বাহুল্য। অত্যাচারী বৃটিশ সরকারের বিভিন্ন দমনমূলক পদক্ষেপ এর বিরুদ্ধে পাঞ্জাবে ব্রিটিশ বিরোধী গণআন্দোলন ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর হতে শুরু করল। পাঞ্জাবের মুখ্য প্রশাসক লেফটেন্যান্ট গভর্নর মাইকেল এর অকথ্য অত্যাচার ও চরম নির্যাতন পাঞ্জাব প্রদেশকে বারুদের স্তূপে পরিণত করে।


অহিংসাবাদী গান্ধীজি রাওলাট আইন প্রবর্তনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বড়লাট লর্ড চেমসফোর্ডকে তা কার্যকারী না করার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু গান্ধীজির আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়। এবার বাধ্য হয়ে গান্ধীজি সমগ্র ভারতব্যাপী সত্যাগ্রহ আন্দোলনের ডাক দেন।


গান্ধীজির ডাকে ৬ই এপ্রিল ১৯১৯ দেশজুড়ে ভারতের প্রথম সর্বভারতীয় ধর্মঘট পালিত হয়। ধর্মঘটের দিনই দিল্লিতে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারালেন আট জন। আহত হলেন প্রায় একশো জন ধর্মঘটি। গান্ধীজি সমস্ত  নিষেধ অগ্রাহ্য করে পাঞ্জাবের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। কিন্তু দিল্লির কাছে পালওয়াল স্টেশনে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হল। যে আগুন ধিকি ধিকি জ্বলছিল তা যেন স্ফুলিঙ্গের আকার নিল গান্ধীজির গ্রেপ্তারিতে।


আরও আছে। রাওলাট অ্যাক্ট এর প্রতিবাদের জন্য People’s Committee অমৃতসর ও লাহোরে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। ১০ই এপ্রিল স্থানিয় দুই জনপ্রিয় নেতা সৈফুদ্দিন কিচলু ও ডঃ সত্যপালকে হিংসায় মদত দেওয়ার অপরাধে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। এই খবর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে বিক্ষোভ এবার দাবানলের মতন ছড়িয়ে পড়ে।


অমৃতসরের জনতার ধৈর্য্যর বাঁধ অবশেষে ভাঙল। তারা তাণ্ডব চালাল ব্রিটিশ ব্যাঙ্কের ওপর। সেখানে খুন হলেন চারজন ব্রিটিশ ব্যাঙ্ক ম্যানেজার। আগুন জ্বলে উঠল গোটা পাঞ্জাব প্রদেশে। চালু করা হল সামরিক শাসন। ক্ষমতার অধীশ্বর হলেন জেনারেল রেগিনাল্ড ডায়ার। পুরো  নাম রেগিনাল্ড এডওয়ার্ড হ্যারি ডায়ার।


এমন একজন অখ্যাত মানুষ, যিনি আর মাত্র দু’দিন পরেই ইতিহাসের পাতায় কুখ্যাত হতে চলেছেন অমৃতসরের কসাই (the butcher of Amritsar) নামে। অথচ এই ভারতবর্ষের সাথে তার কিন্তু আত্মার টান থাকা উচিত ছিল। এই ভারতবর্ষের মাটিতেই তার জন্ম ১৮৬৪ সালে, বেড়ে ওঠাও এই দেশেই। অভিভক্ত ভারতের মারী (Murree)-তে তার জন্ম যা বর্তমানে পাকিস্তানের অন্তর্গত।


ডায়ারের ঠাকুরদা এবং ঠাকুরমা, জন এবং জুলিয়া ডায়ারের বিবাহ হয় কলকাতায়। বাবা এডওয়ার্ড ডায়ার পাঞ্জাবের সেনা শহর কসৌলিতে ভারতের প্রথম আধুনিক বিয়ার কারখানা খুলেছিলেন ১৮৫৫ সালে। তাঁর বিয়ার ব্র্যান্ডের নাম ছিল ‘লায়ন’।


গভীর রাতে ডায়ার যখন অমৃতসর পৌঁছলেন, তখন শহরের বহু ইউরোপিয়ান ভয়ে ও নিরাপত্তাহীনতায় শহরের রেল স্টেশনে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। স্টেশনেই একটি রেল কামরার ভিতর ডেপুটি কমিশনার মাইলস আরভিং-এর সঙ্গে ডায়ার বৈঠক করলেন।


ইংরেজ সরকারের অত্যাচার, রাওলাট আইনের মতন নির্যাতনমূলক আইনের বিরোধিতা, গান্ধীজি ও স্থানিয় নেতাদের গ্রেফতারি এমনই নানা ঘটনা পরিপ্রেক্ষিতে এক প্রতিবাদ সভার ডাক দেওয়া হল ১৩ই এপ্রিল। বেছে নেওয়া হল জালিয়ানওয়ালাবাগকে। উল্লেখযোগ্য এক উৎসবের দিনও ছিল সেটি। সেদিন ছিল পাঞ্জাবের অন্যতম বৃহৎ উৎসব বৈশাখীর দিন। ১৬৯৯ সালের ১৩ এপ্রিল খালসা প্রতিষ্ঠা করেন শিখ সম্প্রদায়ের দশম গুরু গোবিন্দ সিং। প্রতি বছর এই দিনটিতে সারা পাঞ্জাবে বৈশাখী অনুষ্ঠিত হয়।


এদিকে ডায়ার সকালে শহর পরিক্রমা করেই ঘোষণা করে দেন জরুরি অবস্থার। শহরের উনিশটি জলবহুল স্থানে স্থানে ঘোষণা করে জানিয়ে দেওয়া হয়, —সবরকমের মিছিল, মিটিং বা জমায়েত করা নিষিদ্ধ। রাস্তায় চারজনের বেশি মানুষের জমায়েত করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।


ডায়ারের ঘোষণাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একটু বেলা হতেই জালিয়ানওয়ালা বাগে উৎসাহী মানুষের জমায়েত শুরু হয়। দুপুর গড়াতেই সেই জমায়েত জন সমুদ্রের আকার নেয়। নারী ও শিশু সমেত প্রায় কুড়ি হাজার মানুষ তখন দখল নিয়েছেন জালিয়ানওয়ালাবাগের। শুরু হল কংগ্রেসি নেতাদের ভাষণ।


ফুঁসে উঠলেন জেনারেল রেগিনাল্ড এডওয়ার্ড হ্যারি ডায়ার। সদর্পে তিনি এগিয়ে এলেন জালিয়ানওয়ালাবাগের দিকে। সঙ্গে একশো গুর্খা সৈন্য আর দু’টি সাজোয়া গাড়ি। একমাত্র প্রবেশ পথটি আগলে দাঁড়ালেন ডায়ার। দু’চোখে তার পৈশাচিক দৃষ্টি। তারপর….


ডায়ারের নির্দেশে বিনা প্ররোচনায় নিমেষে গুলি ছুটল প্রতিবাদী জনসমষ্টির দিকে। কোনোরকম সতর্কবার্তা দিয়ে ভিড়কে খালি করার আবেদন না করে তাঁর আদেশে একসাথে গর্জে উঠল অসংখ্য রাইফেল। কেঁপে কেঁপে উঠল জালিয়ানওয়ালাবাগের আকাশ বাতাস। মাত্র দশ মিনিটে ১,৬৫০ রাউন্ড গুলির বৃষ্টি যখন বন্ধ হল মাটিতে চারিদিকে শুধুই মৃত শরীরের ছড়াছড়ি


সরকারি হিসাবে সেদিন মারা গিয়েছিলেন ৩৭৯ জন এবং ১২০০ জন আহত হয়েছে, কিন্তু বেসরকারী মতে সংখ্যাটা এর থেকেও অনেক বেশি। ১৫০০ থেকে ২০০০ –এর উপর মানুষকে সেদিন নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। কংগ্রেস নেতৃত্বের হিসেবে মৃত ও আহতের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১৬০০ ও ১১০০ জন। বেশিরভাগ আহত মানুষ সেদিন হাসপাতালে পৌঁছতে পারেন নি। মৃতদের আত্মীয়রা অনেকেই সারারাত খুঁজেও পান নি প্রিয়জনের দেহ।


এখানেই শেষ নয়, রাওলাট অ্যাক্ট অনুযায়ী সংবাদপত্রের স্বাধীনতার উপর নানা বিধি নিষেধ আগেই ছিল, জেনারেল ডায়ার সংবাদপত্র সেন্সর করে দেন। এর ফলে কোনও সাংবাদিক রিপোর্ট তৈরি করে পরের দিন ভারতের কোনও সংবাদপত্রের অফিসে পাঠাতে পারেন নি।


এই ঘটনার সাতমাস পর ১৯ নভেম্বর হান্টার কমিশন নামক এক তদন্ত কমিশনের মুখোমুখি হতে হয় ডায়ারকে। ডায়ার নিজের কৃতকর্মের জন্য কোনোরকম দুঃখ প্রকাশ করা তো দূরের কথা, উল্টে নিজের এই ঘৃণ্য কাজকে অত্যন্ত গৌরবরে সাথে দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন। স্পষ্ট ভাষায় তিনি জানিয়ে দেন যে, “The shooting was calculated to produce a moral effect”। তিনি বলেন, এটা করা হয়েছে “to force Indian subjects to submit”। তিনি আর‍ও বলেন, তিনি জনতাকে ছত্রভঙ্গ হওয়ার বা সরে যাওয়ার নির্দেশ দিতে কোনোভাবেই ইচ্ছুক ছিলেন না, কারণ সেটা করলে নাকি “people would all come back and laugh at me”। তার কাছে গুলির অপর্যাপ্ততার জন্য তিনি আফসোসও করেন। না হলে আরও অনেক কঠোর তিনি হতে পারতেন বলে উল্লেখ করেন।


শেষের উক্তিটি থেকেই বোঝা যাচ্ছে ডায়ার সম্ভবত হীনমন্যতায় ভুগতেন। তার উপর ‘লোকে হাসবে’ এটা তিনি মানতে পারতেন না। ছেলেবেলায় নিজের তোতলামির জন্য স্কুলে বন্ধুদের বিদ্রুপ, জীবনে প্রায় প্রতিটি ব্যপারে অসফলতা, শারীরিক নানান ত্রুটি ও যন্ত্রণা এ সব মিলেমিশেই তাকে হয়ত এমন নিষ্ঠুর করে তুলেছিল!


যাইহোক জেনারেল ডায়ার আমাদের আলোচনার বিষয় নয়, আমরা জালিয়ানওয়ালায়বাগে ফিরে যাই।


ঘটনার দিন জালিয়ানওয়ালাবাগে উপস্থিত ছিলেন এক বাঙালি ডাক্তার ষষ্ঠীচরণ মুখার্জি। জন্ম হুগলি–‌র দশঘরায় হলেও ডাক্তারি সূত্রে তিনি থাকতেন এলাহাবাদে। শিক্ষাবিদ ও ভারতের কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট মদনমোহন মালব্য পার্টির কাজ দেখাশোনার জন্য ডাঃ মুখার্জিকে অমৃতসর পাঠান ১৯১০–‌এ। এরপর তিনি আর এলাহাবাদে ফিরে জাননি।


অভিশপ্ত সেই দিনে ডাঃ মুখার্জি ভাষনের জন্য তৈরি মঞ্চের নীচে চলে গিয়ে কোনমতে প্রাণে বাঁচেন। সামনে থেকে তিনি দেখেছিলেন ভারতেরই মাটিতে জন্ম নেওয়া এক ইংরেজের বর্বরতার নমুনা। তিনি ঠিক করেন জালিয়ানওয়ালাবাগে শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে গড়ে তুলবেন একটি স্মৃতিসৌধ। তিনি জাতীয় কংগ্রেসকে স্থানটি অধিগ্রহণ করতে অনুরোধ করেন।


অপরদিকে ইংরেজ সরকারও স্থানটি অধিগ্রহণ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তারা এই বর্বরোচিত হত্যাকান্ডের প্রমাণ লোপ করার জন্য স্থানটিতে একটি কাপড়ের বাজার তৈরি করতে উদ্দত হল। অনেক টানাপোড়েনের পর ১৯২০ সালে কংগ্রেসের বৈঠকে জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি পাশ হল। দাম ঠিক হয় ৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা। সেই সময় সাড়ে ছয় একর জমিটির মালিক ছিলেন হিম্মত সিং। টাকার জোগার করতে গান্ধীজি ভারতবাসীকে অর্থ দান করার জন্য আবেদন জানালেন। ডাঃ মুখার্জি নিজে প্রতিটি মানুষের দরজায় দরজায় অর্থ সংগ্রহের জন্য ঘুরতে লাগলেন। একত্রিত হল প্রায় ৯ লাখ টাকা। এরপর ১৯২০ সালের ১লা আগস্ট, ডাঃ ষষ্ঠীচরণ মুখার্জি নিলামে কিনে নিলেন জালিয়ানওয়ালাবাগের সেই শহীদের রক্তে রাঙানো ‘পবিত্র ভূমি’।


১লা মে ১৯৫১ গঠিত হয় জালিয়ানওয়ালাবাগ ন্যাশনাল মেমোরিয়াল ট্রাস্ট। যার প্রথম সম্পাদক ছিলেন ডাঃ ষষ্ঠীচরণ মুখার্জি। চেয়ারম্যান হলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। স্মৃতিসৌধের নকশা তৈরি করলেন আমেরিকার বিখ্যাত স্থপতি বেঞ্জামিন পোলক। ১৯৬১ সালের ১৩ এপ্রিল, আর এক বৈশাখীর দিনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর উপস্থিতিতে ভারতের রাষ্ট্রপতি ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ জালিয়ানওয়ালাবাগ শহিদ স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন করেন।


আজও জালিয়ানওয়ালাবাগ ন্যাশনাল মেমোরিয়াল ট্রাস্ট ও স্মৃতিসৌধটির দায়িত্বে আছেন ডাঃ ষষ্ঠীচরণ মুখার্জির পরিবার। বর্তমান সম্পাদক ডাক্তার মুখার্জি–‌র নাতি সুকুমার মুখার্জি।


জালিয়ানওয়ালাবাগ প্রসঙ্গে যার কথা না বললে কাহিনী অসম্পূর্ণ থেকে যায় তিনি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ। এই হত্যাকান্ড তাঁকে সবদিক থেকে ভেঙেচুরে দিয়েছিল। ব্রিটিশ ধর্মযাজক ও শান্তিনিকেতনের শিক্ষক সি এফ অ্যান্ডরুজ তখন শান্তিনিকেতন থেকে দিল্লি গিয়েছিলেন। তিনি কবির ঘনিষ্ঠ সহযোগীও ছিলেন। তাঁর মারফত রবীন্দ্রনাথ খরব পেলেন জালিয়ানওয়ালাবাগের। এমনও হতে পারে তা কবির চিন্তারও বাইরে ছিল। রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত মর্মাহত হন, তাঁর দুশ্চিন্তা ও রাগের বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় ২২ মে ১৯১৯ সালে কিশোরী রানু অধিকারীকে লেখা এক চিঠিতে, “আকাশের তাপ আমি একরকম সইতে পারি। মর্ত্যের প্রতাপ আর সহ্য হয় না। তোমরা তো পাঞ্জাবে আছ। পাঞ্জাবের দুঃখের খবর বোধহয় পাও। এই দুঃখের তাপ আমার বুকের পাঁজর পুড়িয়ে দিলে। ভারতবর্ষে অনেক পাপ জমেছিল। তাই অনেক মার খেতে হচ্ছে। মানুষের অপমান ভারতবর্ষে অভ্রভেদী হয়ে উঠেছে।”


এই সময় কথাবার্তা কমে যায় ও তিনি লেখালেখিও প্রায় বন্ধ করে দেন। মুখে হাসি নেই। শরীরও রাগে-দুঃখে ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছিল। শেষে তিনি জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া ‘নাইটহুড’ উপাধি ত্যাগ করার পরিকল্পনা করে বড়লাটকে চিঠি লিখলেন। এই রকম আরো নানা ঘটনা, প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সাক্ষী থেকেছে ভারতবর্ষ। সে সব কথা অন্য কোন পর্বে আলোচনা করা যাবে।


কোন নৃশংস অতীতের স্মৃতি নিয়ে আলোচনার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই, তবুও পিছন ফিরে তাকাতেই হয় আমাদের। ক্ষমতালোভী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বর্ববরতাই হোক বা বর্তমান স্বাধীন আধুনিক তথাকথিত গণতন্ত্রের চর্বিত চর্বণই হোক চিরকাল সাধারণ নিরপরাধ মানুষই নরমেধ যজ্ঞের বলি হয়েছে। তা সে সন্ত্রাসবাদী হামলাই হোক অথবা রাজনৈতিক দলের পারস্পরিক সংঘর্ষই হোক। কাশ্মীরের পুলওয়ামার হত্যাকান্ডই হোক বা মাত্র দুদিন আগে বঙ্গে ভোটকে কেন্দ্র করে কোচবিহারের মাথাভাঙার শীতলকুচির ঘটনাই হোক, সবই মানুষের উপর মানুষের পাশবিকতা। এর পিছনে আত্মরক্ষার তাগিদই থাক অথবা কারো প্ররোচনাই থাক কিংবা আড়াল থেকে কারো নির্দেশ বলি কিন্তু সাধারন মানুষ, আম-জনতা। কোথাও একটা মিল যেন থেকেই যায়। অদৃশ্য কোন সুতোয় যেন বোনা সবকটি ঘটনাই। পাঠক তাই একটু তলিয়ে ভাবলেই এদের পারস্পরিক মিল খুঁজে পেতেই পারেন। আর সেই কারণেই প্রসঙ্গক্রমে হলেও অতীত তাড়া করে ফেরে আমাদের। নিজেদের বর্তমান সময়ের কদর্যতা, হিংস্রতা এবং অমানবিকতাকে ঢাকতে আমরা অতীতের কোলে সান্ত্বনা খুঁজে ফিরি।