পিতা যখন সৎ পিতা থেকে ভয়ংকর হয় - ব্যক্তি অভিজ্ঞতা

আমি আমার ব্যক্তি জীবনের একটি অভিজ্ঞতা এই গল্পে তুলে ধরেছি। সমস্ত চরিত্র কাল্পনিক, বাস্তবতার সাথে কোনো মিল নেই। এটা আমার জীবনের ট্রাজেডি।

পিতা যখন সৎ পিতা থেকে ভয়ংকর হয় - ব্যক্তি অভিজ্ঞতা
পিতা যখন সৎ পিতা থেকে ভয়ংকর হয় - ব্যক্তি অভিজ্ঞতা

যতই দিন যাচ্ছে, ততই আসল বাবার প্রতি ঘৃনাও বাড়ছে, সামনে পেলে হয়ত খুন করে ফেলব এমন অবস্থা, কিন্তু তা আমি কখনও সুযোগ পেলেও করব না, কারণ এটা আমাকে তার স্তরে নামিয়ে আনবে।


একজন বাটপার ও অপরাধীর সন্তান যে কতটা অভিশপ্ত হয়, তা শুধু আমি জানি, আর কেউ না। কিন্তু জীবনটা সবসময় এমন ছিল না। ছোটবেলাটা অসম্ভব সুন্দর কেটেছে, কখনও কোন কিছুর অভাব বোধ করি নাই।


যা চেয়েছি তাই পেয়েছি, কিন্তু স্বপ্নভাঙ্গার শুরুটাও সেই ছোটকাল থেকে, ক্রিকেটার হতে চেয়েছিলাম, মাকে বলেছিলামও যে বি কে এস পি তে ভর্তি হতে চাই, কিন্তু ক্লাস ওয়ানে থাকতে চোখের অপারেশন হয়, সেই দোহাই দিয়ে ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নভঙ্গ, তারপরেও সব মিলিয়ে ভালোই কেটেছে ছোটবেলা।


বনানিতে দুইটা ফ্লাট, দুইটা দেশে ভ্রমন, প্রতি মাসে একবার চাইনিজ, স্কুল থেকে ছুটি পেলে পারিবারিক বিয়ের দাওয়াত, পিকনিক, বাংলাদেশের খেলা হলেই ম্যাচের ফ্রি ভি আই পি টিকেট, জন্মদিন ধুমধাম করে উদযাপন, আরো কত কি!


এককথায় বললে, একটা বুর্জোয়া কালচারের সন্তানের যে যে সুযোগ সুবিধা পাওয়া সম্ভব, তার সবই পেয়েছি। এ সবকিছুর নেপথ্যেই ছিলেন মিস্টার আজাদ জলিল খান।


সমাজের চোখে যিনি আমার সৎ বাবা, আমি তাকে পশ্চিমাদের মত পাপা বলে ডাকতাম, যদিও তার পরিবার কখনও আমাকে মেনে নেয় নি, তা তিনি কখনও বুঝতে দেন নাই।


সেটা নিঃসন্দেহে আমার জীবনের হানিমুন পিরিয়ড ছিল। মাকেও একটা নিজের পার্লার করে দিয়েছিলেন স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য।


কিন্তু সবকিছু হঠাৎ এলোমেলো হয়ে গেল ২০০৭ সালের ২০ শে অক্টোবর, পাপাকে মা ডাকছে কিন্তু পাপা ঘুম থেকে উঠছে না। আমি দৌড়ে পানি নিয়ে তার মুখে ছিটাচ্ছি, কিন্তু কোন সাড়া শব্দ পাচ্ছি না।


বারডেমে নেওয়ার জন্য এম্বুলেন্স আসলো, মা সমানে হু হু করে কাঁদছে, পুরো এলাকার মানুষ আমাদের হাহাকার দ্যাখার জন্যে বাসার সামনে জড়। আমারও মাথা কাজ করা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।


আমি আমার এক আংকেলের সাথে গাড়িতে, হলি ফ্যামিলি ক্রস করে বেইলি রোডে আসার আগেই ফোন আসলো, আঙ্কেল কোন কিছু বলছে না, গাড়ি ঘুরিয়ে বনানিতে নিতে বলল, আর ফুপিয়ে কাঁদছে।


ততক্ষনে যা বোঝার তা বোঝা হয়ে গেছে, কিন্তু তারপরেও বোকার মত কাঁদছি এবং প্রতিনিয়ত জিজ্ঞেস করে যাচ্ছি, যদি পজিটিভ কোন উত্তর পাই। কিন্তু যে সর্বনাশ হওয়ার তা ততক্ষনে হয়ে গেছে।


কিন্তু আগের রাতে তিনি সম্পূর্ণ খোশমেজাজে ছিলেন, রাতে একসাথে খেলাও দেখি আমরা। সকালে উঠেও বাংলাদেশের টেস্ট ম্যাচ দেখছিলাম আর পাপার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।


তার দাফনের তিন দিনের মধ্যেই, তার বড়ভাইয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে বনানির ফ্লাটের কোন টাকা আমরা তুলতে পারব না।


ভাগ্য ভালো ছিল যে, তখনও মার পার্লারটা ছিল যার কারণে কয়েক মাস চলতে পেরেছি আমরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মার ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার অভাবে সেই পার্লারটাও অনেক কম দামে বিক্রি করতে হয়েছিল।


পাশাপাশি মাও পাপার বড় ভাইয়ের সাথে আইনি লড়াইটা চালিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত মা একটা ফ্লাটের চারভাগের একভাগের টাকা পায়, যা দিয়ে মা আমার ইন্টার পর্যন্ত পড়াশোনা চালায়। আর বাকি টাকা ভুল মানুষকে ব্যবসা করতে দিয়ে লস খায়।


পাপার মৃত্যুর পর থেকেই আমি একরোখা হয়ে যাই, অভাব কখনও দেখি নাই, তাই প্রথম ধাক্কায় অভাবটা নিতে পারতাম না। কিন্তু মা তারপরেও আমাকে কখনও ছেড়ে যায় নাই।


কিন্তু একসময় মার সঞ্চয়ও ফুরায় যায়। তাই একরকম ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাধ্য হয়ে আমাকে আমার আসল বাপের সাথে যোগাযোগ করা লাগে।


আমার কাছে সে একজন জাতীয় বেঈমান, কারন তার যে মামা মামির কাছে সে বড় হয়েছে, সে তাদের সাথেও বেঈমানি করে, সে মূলত আমার নানীর বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে আসে, মার সাথে সেখানেই তার প্রেম হয়।


আমার নানীর ঘোর আপত্তি থাকা সত্ত্বেও মার দিকে তাকিয়ে তাদের বিয়ে দেন এবং পরবর্তীতে মগবাজারের বাড়ি বন্ধক রেখে অ্যামেরিকা পাঠানোর খরচ দেন তার মেয়ের এবং নাতির ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করার উদ্দেশ্যে।


কিন্তু হলো তার উল্টাটা, সে মার বিশ্বাস ভেঙে অন্য একাধিক নারির সাথে সম্পর্কে জড়ায় এবং পরবর্তীতে মার ব্যাপারে বিভিন্ন ধরনের ভিত্তিহীন এবং মিথ্যা অভিযোগ রটনা করে বিভিন্ন মানুষের কাছে, এমনকি মাকে ওই মহিলার কাছে মাফ চাওয়ার শর্ত দেয় সংসার চালায় যাওয়ার জন্য, কিন্তু আমার মা যা তা ফ্যামিলির মেয়ে না যে তার অন্যায় শর্ত মেনে নিবে। শেষ পর্যন্ত তাদের তালাক হয়।


ইন্টার শেষ করানোর পর,মা ভার্সিটির প্রথম তিন সেমিস্টারের খরচ পর্যন্ত দিতে সক্ষম হন, কিন্তু এরপর মার সঞ্চয় ফুরায় যায়, প্রয়োজনের তাগিদে আমি  আমার আসল বাবার সাথে যোগাযোগ করতে বাধ্য হই।


তার কাছে শুধু এতটুকুই চাওয়া ছিল যাতে সে আমার গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করার আগ পর্যন্ত যেন আমার খরচটা চালায়।


যদিও প্রথম প্রথম ঠিকঠাক ভাবে খরচ দিত, তারপরে অসুস্থতা, কেইস, ট্যাক্স ইত্যাদি বিভিন্ন টালবাহানা করত মাঝে মাঝেই, কিন্তু আমার ইউনিভার্সিটি তো আর বুঝবে না যে, তার ফ্রড কেইস আছে অ্যামেরিকায়, আমি তো আর তার মত ক্রিমিনাল না আমি পড়াশোনাই করতে চেয়েছি।


কিন্তু একজন অশিক্ষিত, সুযোগ সন্ধানী, বাটপার ক্রিমিনাল তো কখনওই শিক্ষার মর্ম বুঝবে না, এবং এটা যে সে আমার প্রতি অন্যায় করছে, সেটা বোঝারও বোধশক্তি তার নাই।


আজ প্রায় দুই বছরের কাছাকাছি হতে চলল, সে আসল পিতা আমার ভার্সিটির খরচ বন্ধ করে দিয়েছে, এবং এতে তার বিন্দুমাত্র অনুশোচনাও নাই।


গত এক বছর যাবত সে পায়তারা করছে কিভাবে আমার সব খরচ বন্ধ করা যায়, যখনই পড়াশোনার কথা বলি, তখনই আমাকে ব্লক করে দেয়। আগে তো নুন্যতম লজ্জাবোধ কাজ করত এখন তাও করে না।


আমি আর মা তার টাকার গরমের কাছে একপ্রকার জিম্মি। কিন্তু আমাদেরকে সাহায্য করার কেউ নাই। এমনকি সে কিছুদিন আগে আমাকে বলে এখন কাউকেই পরোয়া করে না, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেও না।


কিন্তু ঠিকই শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে আবার সেলফি তুলে বেড়ায়। নিজের আপন ছেলের পড়াশোনা বন্ধ করায় শিক্ষামন্ত্রীর সাথে সেলফি তোলাটা হিপোক্রেসি আর আয়রনির শেষ পর্যায় বলা যায়।


একজন নির্লজ্জ মানুষ দ্বারাই কেবল এটা সম্ভব।


আরও পড়ুনঃ প্রিয়তমা শুধু তোমার জন্য - ছোটগল্প