মানুষের চরিত্র গঠনে পরিবারের ভূমিকা কতখানি? জেনে নিন

সবদিক দিয়ে বিচার করলে দেখা যায় একটা শিশুর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, সুন্দর চরিত্র, নির্ভর করে তার পরিবারের উপর।

মানুষের চরিত্র গঠনে পরিবারের ভূমিকা কতখানি? জেনে নিন
মানুষের চরিত্র গঠনে পরিবারের ভূমিকা কতখানি? জেনে নিন


সুন্দর ব্যবহার চিরদিনই আকর্ষিত করে মানুষকে। মানুষ জন্ম থেকেই কোন কিছু আগের থেকে শিখে আসে না। যা কিছু শেখে, যা কিছু জানে, এই পৃথিবীতে আসার পর থেকেই। তবে একটা শিশুর জন্মের সময় সাদা কাগজের মতোই থাকে তার মন। সেখানে যেমনভাবে লেখা হবে তেমনি লেখা পড়বে সাদা কাগজে।


তেমনি শিশুকে যেভাবে গড়ে তোলা হবে সে সেভাবেই গড়ে উঠবে। সমাজের এবং পরিবারের প্রত্যেকটি মানুষের আচার-আচরণ থেকেই একটা শিশুর প্রাথমিক চারিত্রিক গঠন হয়ে যায়। তাই সে ক্ষেত্রে বলা যায় শিশুর চরিত্র গঠনে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।


পরিবারকে একটা শিশুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ও বলা যায়। কারন জন্মের পর থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত অর্থাৎ স্কুলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত পরিবার থেকেই সে সবকিছু ধীরে ধীরে শিখতে থাকে। পরিবারের বিভিন্ন সদস্যদের আচার-আচরণ, তাদের কথাবার্তা, তাদের ব্যবহার, সে কিন্তু নকল করতে শেখে এবং সেগুলো কে ভালো ভেবেই নিজের মধ্যে আয়ত্ত করতে শিখে যায়। ভালো-মন্দের বিচার তার মধ্যে তখন জন্মায় না। তবে যা কিছু দেখে সেটাকে ভালো হিসেবে মেনে নেয়। কেননা বাচ্চাদের মন দেখে শেখার প্রবণতা বেশি দেখায়।


সমাজ, পরিবেশ অনুযায়ী শিশুর চরিত্রের গঠন হয়। তা না হলে এক এক শিশুর চরিত্র এক এক রকম হত না। আশেপাশের পরিবেশ, পারিবারিক পরিবেশ, পরিবারের সদস্যের ব্যবহার সবকিছু নির্ভর করে একটি শিশুর চরিত্র গঠন করতে।


শিশুর চরিত্র গঠনে পরিবারের ভূমিকা, যেগুলো সবচেয়ে বেশি জরুরি সেগুলো জেনে নেওয়া যাক - 


১. সত্য কথা বলতে শেখানো :

একটা শিশুকে সত্যি কথা বলতে শেখানোটা পরিবারের কর্তব্য। যদি একটা শিশু ধীরে ধীরে দেখতে থাকে যে তার আশেপাশের মানুষজন বা তার বাবা-মা মিথ্যার ওপর ভিত্তি করে জীবন যাপন করছে বা মিথ্যা কথা বলে চলেছেন তাহলে সেও মিথ্যা কথা বলতে শিখে যাবে।


কেননা বাবা-মায়ের যে কোনো আচরণ শিশুরা আয়ত্ত করতে শেখে। সে ক্ষেত্রে সত্যি কথা বলতে সেখানে তার সাথে সাথে নিজেদের ও সত্যি কথা বলতে পারাটাও অনেকটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুকে যেই আচরণগুলি শেখানো জরুরি

অলসতা পরিত্যাগ করার উপায় ও কৌশল জেনে নিন

বোকা মানুষ চেনার ৫ টি সহজ উপায় ও তাদের লক্ষণ

সেরা ৭ টি উপায় নিজের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জন্য

পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ার ৬ টি সেরা কৌশল


২. বড়দের সম্মান :

কথা বলতে সবাই পারে, কিন্তু কোথায় কোন কথা বলতে হয়, কোথায় কোন কথা বলতে নেই সেটা কিন্তু শিক্ষা পাওয়া যায় পরিবারের কাছ থেকে। বড়দের কোন ভুল জানা থাকলেও তাদের সম্মান রক্ষার্থে সেখানে চুপ থাকাটাই শ্রেয়।


৩. কঠোর পরিশ্রমী হতে শেখানো :

সন্তান বাবা-মায়ের কাছে সবসময়ের জন্য আদরের হয়। তবে তা বলে অতিরিক্ত আদর সন্তানের ভবিষ্যত নষ্ট করে দিতে পারে। কষ্ট করে বেঁচে থাকার নামই জীবন। তাই তাকে পরিশ্রমী হওয়ার জন্য উৎসাহিত করা প্রয়োজন। সেই পরিশ্রমই তাকে ভবিষ্যতে সফল হতে সাহায্য করবে। অনেক বাধা বিপত্তি আসবে সে ক্ষেত্রে ভেঙে পড়ে তাকে সেই কঠোর পরিশ্রমী হতে বাধা দেওয়াটা একেবারেই উচিত নয়।


সময় যেমন খারাপ আসে, আবার খারাপ সময় কেটেও যায়। ভালো সময় এর দেখা পেতে গেলে খারাপ সময়ে কষ্ট করাটা অত্যন্ত জরুরী। যেকোনো কাজে সন্তানের কষ্ট হচ্ছে বলে তাকে সেই কাজ থেকে সরিয়ে আনা বোকামি ছাড়া কিছুই নয়। সেই কাজ সম্বন্ধে কোন কিছু শিখতে তো পারবেই না, তার উপরে ভবিষ্যতে গিয়ে কোন কাজে ভয় পেয়ে পিছিয়ে আসতে থাকবে।


৪. টাকার গুরুত্ব বোঝা :

শিশুরা বায়না অবশ্যই করবে তবে তাদের যদি ভালোভাবে বোঝানো যায় যে যেটা জরুরী আজ এটা জরুরী নয়। সে ক্ষেত্রে সেই শিশু অবশ্যই বুঝবে। বায়না অনুযায়ী সব সময় সবকিছু পূরণ করতে হবে এমন তো কোন কথা নেই, সে ক্ষেত্রে সে কোনদিনও টাকার গুরুত্ব বুঝবে না। অহেতুক খরচ বেড়ে যাবে তার বয়স বাড়ার সাথে সাথে।


সবদিক দিয়ে তাকে গড়ে তোলার সাথে সাথে টাকা-পয়সার বিষয়ক কিছু শিক্ষা দেওয়া জরুরি। যেহেতু এই টাকার ওপর ভিত্তি করে অনেক কিছু নির্ভর করে। কথায় আছে ছোট থেকে শিশুরা যে শিক্ষায় শিক্ষিত হয় বড় হয় সেই শিক্ষাই তার মধ্যে থেকে যায়। তাই যত ভালো শিক্ষা ছোট থেকে একটা শিশু পাবে, তত বড় হওয়ার সাথে সাথে তার চরিত্র গঠনে অনেকটা সহযোগিতা হবে।


৫. মার্জিত কথাবার্তা :

একটা মানুষকে জীবনে বাঁচতে গেলে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, অনেকেই আছেন কারো সম্পর্কে সম্পূর্ণ না জেনে যেকোনো রকম মন্তব্য করে বসেন, সেই মন্তব্যের কারণে সেই মানুষটার কতটা কষ্ট হতে পারে সেটা বোঝার মত ক্ষমতা সে মন্তব্যকারীর থাকেনা।


তাই মার্জিত কথা সবাইকে আকর্ষিত করে। অহেতুক বাজে কথা থেকে, বাজে তর্ক থেকে, নিজেকে সরিয়ে কিভাবে রাখা যায় সেই শিক্ষাও দেওয়া জরুরী একটা শিশুকে। তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন।


৬. সুস্থ স্বাভাবিক জীবন যাপন :

একটা মানুষ বেঁচে থাকাকালীন অনেক রকম বদ অভ্যাসে জড়িয়ে পড়ে। সে ক্ষেত্রে ছোট থেকেই ভালো-মন্দের বিচার তার মধ্যে যদি থেকে থাকে, সুস্থ স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে তার কোনো রকম অসুবিধা হবে না, এটি কোন ঝামেলায় না জড়িয়ে নিজের জীবনের প্রতি লক্ষ্য রেখে চলার মনোভাব তৈরি করার দায়িত্ব পরিবারের।


বাবা-মাকে এই দায়িত্ব বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পালন করতে হয়। তবেই না একটা শিশু ভবিষ্যতে গিয়ে স্বাবলম্বী হতে পারে।


৭. নিয়ম-শৃঙ্খলা :

অগোছালো জীবন যাপন মানুষের মনকে বিষিয়ে তোলে। ছোট ছোট বিষয়ের উপর খেয়াল রেখে শিশুদেরকে একেবারে বুঝতে শেখা থেকেই নিয়ম-শৃঙ্খলা শেখানো জরুরী।


যেমন ঘরকে সুন্দর করে গুছিয়ে রাখা, নিজের জরুরী জিনিসপত্র নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা, হেলদি খাবার খাওয়া, নিয়মমতো পড়াশোনা করা, শরীরকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা, পোশাকও পরিষ্কার রাখার মনোভাব তৈরি করা, আরো অনেক ছোট ছোট বিষয় তাদের মনের মধ্যে একবার গেঁথে দিতে পারলেই তারা আনন্দ পাবে এই সবগুলো করার মাধ্যমে।


তার সাথে পরিবারের সদস্যের বিশেষ করে মায়েরা যদি তাদের সাথে নিয়ে কোন কিছু তৈরি করা, তাদের জন্য নতুন করে কিছু শেখানো, এসব একটা শিশুকে এতটাই আনন্দ দেয় যে, তারা সে সবগুলো ফলো করতে শেখে। নিজে থেকে সেগুলো করার চেষ্টা করে। তার ফলে তাদের মস্তিষ্কের সৃজনশীলতা মনোভাবের সৃষ্টি হয়। নতুন নতুন কোন কিছু করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে তারা।


সবদিক দিয়ে বিচার করলে দেখা যায় পরিবারের ভূমিকা একটা মানুষের চরিত্র গঠনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এমন শিক্ষা হয়তো  বিদ্যালয় থেকে শিখতে পাওয়া যায় না, বিদ্যালয় থেকে হয়তো পুঁথিগত বিদ্যা টুকু পাওয়া যেতে পারে। তবে এইসব শিক্ষা শুরু থেকেই পরিবারের সদস্যদের থেকেই পাওয়া যায়। তাই শিশুদের চরিত্র গঠনে পরিবারকে আরো বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে